Tears of Victim

ভূলুন্ঠিত মানবাধিকার

520

আওয়ামী মেয়াদজুড়েই রিমান্ড, পঙ্গু করে দেয়া, গুম, খুন, গুপ্তহত্যা ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ছিল নিয়মিত দৃশ্য। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে ভুয়া মামলা, তাদের পঙ্গু করে দেয়া, শ্যোন অ্যারেস্ট, রিমান্ড, গুম, খুন, গুপ্তহত্যা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং মানবাধিকার সংস্থার ওপর আক্রমণের মধ্য দিয়েই বর্তমান ফ্যাসিবাদী সরকার মেয়াদ শেষ করছে। স্বৈরাচারী মহাজোট সরকারের এসব মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে আজ দেশে মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত এবং বিপন্ন। পাঁচ বছরে দেশে এমন বহু হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যার ভয়াবহতা বর্ণনা করলে শিউরে উঠতে হয়। সরকারের শুরু থেকেই পুরো মেয়াদজুড়ে বিরোধী নেতাকর্মীদের দমন-পীড়নের নিমিত্তে মিছিল-সমাবেশে নির্বিচারে চালানো হয় গুলি। গণতান্ত্রিক দেশে বিরোধী মত দমনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে স্বৈরতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ব্যবহার করা হয়।

রিমান্ড
বিরোধী দল ও মতের নাগরিকদের দমনে রিমান্ডের যথেচ্ছ ব্যবহার করে সরকার। কোনো ধরনের অভিযোগ বা সুনির্দিষ্ট মামলা ছাড়া কিংবা মামলা থাকলেও তদন্ত ও অনুসন্ধানের আগেই দিনের পর দিন রিমান্ডে রেখে নির্যাতন চালানো হয়েছে বিরোধী মতের লোকদের ওপর। রিমান্ড মঞ্জুর ও জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেয়ার ক্ষেত্রে সরকারের অবৈধ ইশারায় সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনাকেও আমলে নেয়নি নিম্ন আদালতগুলো। রিমান্ড মঞ্জুরের ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও আদালত তা প্রতিনিয়তই লঙ্ঘন করেছে বলে অভিযোগ করেন মানবাধিকার সংগঠক ও বিশিষ্ট আইনজীবীরা। বর্তমান আমলে সাম্প্রতিককালে রিমান্ডে নির্যাতনের ঘটনায় আলোচনায় উঠে আসেন আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম, হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী, বিএনপি নেতা জয়নুল আবদীন ফারুক, আমান উল্লাহ আমান, বরকত উল্লাহ বুলু, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলোয়ার হোসেনসহ আরও অনেকে। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলায় শামীম রেজা নামের এক তরুণকে ৫ লাখ টাকা ঘুষ না পেয়ে রিমান্ডের নামে এক পুলিশ কর্মকর্তার বাসায় নিয়ে নির্যাতন করে হত্যার অভিযোগ করে তার পরিবার। একইভাবে বর্তমান সরকারের শাসনামলের শুরুতে সাবেক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এম ইউ আহমেদকেও গোয়েন্দা পুলিশ সেগুনবাগিচা থেকে আটক করে নিয়ে যায়। পরে ডিবি কার্যালয়ে নির্যাতনের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ করে তার পরিবার।

হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব আল্লামা জোনায়েদ বাবুনগরীর মতো একজন ধর্মীয় নেতাকেও রিমান্ডে নির্যাতন করে মৃতপ্রায় অবস্থায় হাসপাতালের আইসিইউ-তে ভর্তি করা হয়। অপরদিকে দেশের সর্ববৃহৎ সুশৃঙ্খল ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলাওয়ার হোসেনকে রিমান্ডে নির্যাতন শেষে মৃত প্রায় অজ্ঞান অবস্থায় পায়ে বেড়ি লাগিয়ে আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন ইতিহাসে বিরল। স্বাধীনতার বিয়াল্লিশ বছরের ইতিহাসে এভাবে কোনো ছাত্রসংগঠনের নেতাতো দূরের কথা বরং কোন সাধারণ মানুষকেও ৫৭ দিনের এত দীর্ঘ রিমান্ডে নিতে দেখা যায়নি। আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে ২০১০ সালে ১ জুন প্রথম গ্রেফতার করা হয় এবং রিমান্ডে নিয়ে পৈশাচিক নির্যাতন চালানো হয়। এরপর গত ১১ এপ্রিল তাকে দ্বিতীয়বার গ্রেফতারের পর প্রথম দফায় দুটি মামলায় ১৩ দিনের রিমান্ডে আনে পুলিশ। রিমান্ডে নির্যাতন ও অনশনে তার অবস্থা খারাপ হলে তাকে রিমান্ড শেষ হওয়ার আগেই তড়িঘড়ি আদালতে হাজির করা হলে তিনি আদালতকে জানান, তাকে ইলেকট্রিক শক দেয়া হয়েছে এবং তার হাত-পা ও শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। আদালত তাকে জেলে পাঠালে জেল কর্তৃপক্ষ তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে স্থানান্তর করে। সেখানে তাকে সিসিইউতে রাখা হয়। পরে সুস্থ হলে আবার কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। এ বছর গ্রেফতারের পর গত রমজান মাসে তাকে দ্বিতীয় দফায় রিমান্ডে নেয়া হয়। একটি পত্রিকার সম্পাদককে নির্যাতনের এই নজির বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সম্পূর্ণ নতুন।

মানবাধিকার সংগঠন “অধিকার” সম্পাদক আদিলুর রহমানকে ২০১৩ সালের ঈদুল ফিতরের পর ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করে রিমান্ডে পাঠানো হয়। পরে হাইকোর্ট রিমান্ড বাতিল করে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেয়।
বিএনপি কার্যালয় থেকে আটক ১৫১ নেতাকে ডাণ্ডাবেড়ি পরিয়ে আদালতে হাজির করা হয়। আদালত তাদের একযোগে ৮ দিনের রিমান্ডে পাঠায়। ৫৪ ধারায় গ্রেফতারের পর কোনো মামলা বা অভিযোগ ছাড়াই ২০ নারীকে রিমান্ডে পাঠানোর মত ঘটনাও ঘটে এ সরকারের আমলে এ রকম হাজারো ঘটনা নিয়মিত ঘটেছে।

গ্রেফতারের পরে গুলি করে পঙ্গু করা
বর্তমান সরকারের আমলে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের গুলিতে আহত ও পঙ্গু হয়েছেন কয়েকশ’ মানুষ। এসব গুলিবিদ্ধের মধ্যে বেশিরভাগই বয়সে কিশোর-তরুণ। তবে আটককৃত বা গুলিবিদ্ধ ভিকটিম পরিবারের দাবি, অভিযানের নামে নিরপরাধ ব্যক্তিকে আটকের পর অপরাধী সন্দেহে তাদের চোখ বেঁধে নির্জন স্থানে নিয়ে গুলি করা হয়েছে। বিভিন্ন সময় আহতদের আত্মীয়-স্বজন ও পরিবারের সদস্যরা এ ধরনের বহু অভিযোগ করেছেন, যা মিডিয়ার মাধ্যমে সারা দেশের মানুষ দেখেছে।
এগুলোর মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা নিচে উল্লেখ করা হলো-

পায়ে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করা হয়েছিল লিমনের
২৩ মার্চ ২০১৩ বিকেলে লিমন মাঠ থেকে গরু আনতে বাড়ির বাইরে যায়। পথে স্থানীয় শহীদ জমাদার বাড়ির সামনে র‌্যাব-৮ এর একটি দল তাকে সামনে পেয়ে শার্টের কলার ধরে নাম জিজ্ঞেস করে। লিমন নিজেকে ছাত্র বলে পরিচয় দেয়। কিন্তু র‌্যাবের এক সদস্য কথাবার্তা ছাড়াই তার বাম পায়ে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে দেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার পা কেটে ফেলতে হয়। পঙ্গু হয়ে যায় ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া গ্রামের দিনমজুর তোফাজ্জল হোসেনের ছোট ছেলে ও এইচএসসি পরীক্ষার্থী লিমন। র‌্যাব তাকেসহ তার বাবা মার বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা দান ও অস্ত্র মামলা দেন। এ ঘটনায় বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন প্রতিবাদ করলে এক পর্যায়ে সরকার কর্তৃক একক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে লিমনের মামলা প্রত্যাহার করা হয়।

নির্মম নির্যাতনের শিকার হল ঢাবির মেধাবী ছাত্র আব্দুল কাদের
২০১১ সালের ১৫ জুলাই শুক্রবার দিবাগত রাতে আনুমানিক ১ টার দিকে ডাকাতির পরিকল্পনার অভিযোগে গ্রেফতার হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ রসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী ছাত্র আব্দুল কাদের। খিলগাঁও থানা হেফাজতে থাকা অবস্থায় তার উপর করা হয় অমানুষিক নির্যাতন। তাকে গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের খবরে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তার মুক্তির দাবিতে আন্দোলন করে ছাত্ররা। পরে উচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপে মুক্তি মেলে আব্দুল কাদেরের। মিথ্যা প্রমাণিত হয় তার বিরুদ্ধে দায়ের করা পুলিশের সব মামলা। তাকে গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের দায়ে খিলগাঁও থানার ওসি এবং পুলিশের এক এস আইকে বরখাস্ত করা হয়। উচ্চ আদালতের নির্দেশে দুই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলাও করেন আব্দুল কাদের। প্রাণে বেঁচে যাওয়া আব্দুল কাদের মেধার স্বাক্ষর রেখে ৩৩ তম বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে তিনি উত্তীর্ণ হয়েছেন।

পা কেটে ফেলতে হল আব্দুল্লাহ আল ফাহাদের
২০১৩ সালের ২৮ ফেব্র“য়ারি আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে দেয়া ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে আয়োজিত ফার্মগেট কতুববাগ দরবার শরীফের সামনের মিছিল থেকে গ্রেফতার করে ফাহাদকে। থানায় নিয়ে সাব-ইন্সপেক্টর কামাল তার পায়ে রিভলবার ঠেকিয়ে একাধিক গুলিবর্ষণ করে। দীর্ঘদিন পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি ফাহাদের পায়ে পচন ধরায় তার পা কেটে ফেলতে হয়। আই.আই.ইউ.সি ঢাকা ক্যাম্পাসের দ্বিতীয় বর্ষের মেধাবী ছাত্র আব্দুল্লাহ আল ফাহাদ এখন আর নিজ পায়ে দাঁড়াতে পারেন না পুলিশের এই নির্মম অত্যাচারের কারণে।

আলমগীর হোসেন ভূইয়া আর কি হাঁটতে পারবেন?
২০১৩ সালের ২৮ ফেব্র“য়ারি আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে হরতাল সমর্থনে সংসদ ভবনের সামনের মিছিল থেকে গ্রেফতার হন মোঃ আলমগীর হোসেন ভূইয়া। পরে তাকে শেরে বাংলা থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। সারা দিন তার উপর চলে অমানুষিক নির্যাতন। রাত্রে পুলিশ তার পায়ে রাইফেল ঠেকিয়ে গুলি করলে পা হারান মোঃ আলমগীর হোসেন ভূইয়া।

নয়া দিগন্তের প্রেসকর্মী পথচারী মাহবুব কবীরকে ধরে গুলি করে পা গুঁড়িয়ে দিল পুলিশ
১৮ মার্চ সকালে পুলিশ গুলি করে পঙ্গু করে দেয় নয়া দিগন্তের প্রেসকর্মী (পথচারী) মাহবুব কবীরকে। পথ দিয়ে চলার সময় পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে পরপর দুই রাউন্ড গুলি করে পায়ে। এতে তিনি বেহুঁশ হয়ে পড়েন। এরপর পুলিশ তাকে সাদা মাইক্রোবাসে করে তুলে নিয়ে যায়। এরপরও নিস্তার হয়নি তার। পুলিশ বাদি হয়ে তার বিরুদ্ধে উল্টো মামলা করে। অল্প বেতনের এ কর্মচারী পঙ্গু হওয়ায় এখন তার পরিবার কিভাবে চলবে তা নিয়েই চলছে শঙ্কা।

বিচারবহির্ভূত হত্যা
মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত বছরে (২০১২) ৭০ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নামে অপহরণের পর ২৪ জনকে গুম করা হয়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও তথ্য কমিশন তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। মানবাধিকার কর্মীদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়েছে। অথচ অভিযুক্ত দুর্বৃত্তদের রাজনৈতিকভাবে ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত চিহ্নিত খুনিসহ ২১ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ মওকুফ করেছেন রাষ্ট্রপতি। অধিকার জানায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে ২০১২ সালে দেশে ২৪ জনকে গুম করা হয়েছে। গুম হওয়ার পর কারো কারো ক্ষতবিক্ষত লাশ পাওয়া যায়। গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদেরও অভিযোগ রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ধরে নিয়ে যাওয়ার পর প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে আটক ব্যক্তিকে জনসমক্ষে হাজির ও থানায় হস্তান্তর করেছে।

গুম হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে গার্মেন্ট শ্রমিকনেতা আমিনুল ইসলাম, ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ৫৬ নং ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম, রাবি শিবির নেতা মোঃ আব্দুল্লাহ ওমর নাসিফ শাহাদাত, সীতাকুন্ড ইউনিয়ন জামায়াতের সেক্রেটারি আমিনুল ইসলামসহ অনেককে লাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে পরিজনের কাছে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ৭০ জন। গুমের শিকার ব্যক্তি আরও অনেকেই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অধিকার জানায়, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি ২০০৯-এর ফেব্র“য়ারিতে জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের বৈঠকে বাংলাদেশে সব ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধের অঙ্গীকার করেছিলেন। এ অঙ্গীকারের পরও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ হয়নি। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ফলে ৫৩ জন ক্রসফায়ারে, সাতজন নির্যাতনে ও আটজন গুলিতে নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে র‌্যাবের ক্রসফায়ারেই ৪০ ব্যক্তি নিহত হয়েছেন।

জেল হেফাজতে মৃত্যু
দেশে ২০১২ সালে ৭২ ব্যক্তি বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে সাতজন নিহত হয়েছেন। দেশের ৬৮ কারাগারের ধারণক্ষমতা রয়েছে ৩৩ হাজার ৫৭০ জনের। কিন্তু এসব কারাগারে বন্দী রয়েছে ৬৮ হাজার ৭০০ জন। বিনা চিকিৎসা, নিম্নমানের খাবার ও পানির অসুবিধাসহ বিভিন্ন কারণে বন্দীদের মানবাধিকার প্রতিনিয়ত লঙ্ঘিত হচ্ছে। এ সময়ে জেল হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে ৬৩ জনের।
অন্যদিকে ২০১১ সালে প্রকাশিত অধিকার-এর রিপোর্টে বলা হয়, বর্তমান সরকারের প্রথম তিন বছরে বিচারবহির্ভূত হত্যা অর্থাৎ ক্রসফায়ারে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ৩৬৫টি। এর মধ্যে রয়েছে ২০০৯ সালে ১৫৪টি, ২০১০ সালে ১২৭টি ও ২০১১ সালে ৮৪টি।

গুপ্তহত্যা ও গুমের কয়েকটি ঘটনা
ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারের আমলে নতুন মাত্রায় প্রত্যাবর্তন ঘটেছে গুম এবং গুপ্তহত্যার। সরকারের যাত্রা শুরুর পর থেকেই গুপ্তহত্যা ও গুমের মিছিল ক্রমেই দীর্ঘ হয়েছে। শেখ হাসিনা সরকারের পাঁচ বছরে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী ও চৌধুরী আলমসহ দেশে দেড় শতাধিক ব্যক্তি গুম-গুপ্তহত্যার শিকার হয়েছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর গুম-হত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চলছে। কোনো কিছুতেই কাজ হচ্ছে না। এখনও গুম হচ্ছে মানুষ। গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনরা অসহায় হয়ে পথ চেয়ে আছেন। আদালত-আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মানবাধিকার সংস্থা, রাজনৈতিক নেতা, পত্রিকার অফিস থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্থানে ধরনা দিয়েও স্বজনের কোনো খোঁজ পাচ্ছেন না তাদের। জানতে পারছেন না তাদের স্বজন বেঁচে আছেন, না মরে গেছেন। গুম হওয়া ব্যক্তিরা জীবিত না থাকলে তাদের অন্তত লাশ ফেরত চাইছেন স্বজনরা সংবাদ সম্মেলন করে। সে অধিকারটুকু থেকেও তারা আজ বঞ্চিত।

আওয়ামী লীগ সরকারের পাঁচ বছরে বিএনপির কেন্দ্রীয় দুই নেতাসহ দেড় শতাধিক ব্যক্তি গুম-গুপ্তহত্যার শিকার হয়েছেন। দু’বছর পার হলেও বিএনপি নেতা ও ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলমের খোঁজ মেলেনি। একইভাবে গুম হলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সাবেক এমপি এম ইলিয়াস আলী। গুম হয়েছেন তার গাড়িচালক আনসার আলীও। শ্রমিক নেতা আমিনুল গুম হওয়ার ক’দিন পর তার লাশ উদ্ধার হয়েছে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রশিবির নেতা ওয়ালী উল্লাহ ও আল মুকাদ্দাস এবং সিলেট ছাত্রদলের দুই নেতাও গুম হয়েছেন। একের পর এক গুমের ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। এছাড়াও গুমের তালিকায় রয়েছেন ছাত্রদল, যুবদল, শিবির নেতা, ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি ও বিরোধী মতের মানুষ। এ তালিকায় আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের কয়েকজন নেতাও রয়েছেন। গুম হওয়ার পর কারও লাশ পাওয়া যায় নদীতে, ডোবায়, জঙ্গলে ও ঝোপের মাঝে। তবে অনেকেরই খোঁজ পাওয়া যায়নি।

উল্লেখযোগ্য গুমের মধ্যে ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাতে বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলী ও তার গাড়িচালক আনসার আলী বনানীর সিলেট হাউজের বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন। গভীর রাতে বনানী ২ নম্বর রোডে সাউথ পয়েন্ট স্কুলের সামনে থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় তার গাড়ি উদ্ধার করে বনানী থানার পুলিশ। এ ব্যাপারে আদালতে একটি রিট করা হয়। ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর ইলিয়াস আলীকে খুঁজে বের করার আশ্বাস দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আশ্বাস ও আদালতের নির্দেশের পরও ইলিয়াস আলীকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে পারেনি আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা। অভিযোগ রয়েছে, ইলিয়াস আলীর ঘটনাটি এখন আর তদন্তই করছে না -পুলিশ বা গোয়েন্দারা।
এদিকে বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলম তিন বছরের বেশি সময় ধরে নিখোঁজ।

২০১২ সালের ৪ ফেব্র“য়ারি র‌্যাব পরিচয়ে আটক করে নেয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই মেধাবী ছাত্র আল মোকাদ্দাস ও ওয়ালিউল্লাহর খোঁজ মেলেনি আজও। ঢাকায় ব্যক্তিগত কাজ শেষে হানিফ এন্টারপাইজের গাড়িতে করে ক্যাম্পাসে ফিরছিলেন তারা। রাত সাড়ে ১১টায় রাজধানীর কল্যাণপুর বাস কাউন্টার থেকে ঝিনাইদহ-৩৭৫০ নম্বর গাড়ির সি-১ ও সি-২ সিটে বসে ক্যাম্পাসে আসার পথে রাত সাড়ে ১২টা থেকে ১টার মাঝামাঝি সময়ে সাভারের নবীনগর পৌঁছালে র‌্যাব-৪-এর সদস্য পরিচয় দিয়ে গাড়িটি থামানো হয়। এ সময় র‌্যাবের পোশাক ও সাদা পোশাকধারী ৮-১০ ব্যক্তি গাড়িতে উঠে আল মোকাদ্দাস ও ওয়ালিউল্লাহকে গাড়ি থেকে নামিয়ে নিয়ে যায় বলে তাদের আত্মীয়-স্বজনকে নিশ্চিত করেন গাড়িতে অবস্থানকারী যাত্রীরা এবং সুপারভাইজার সুমন। এরপর থেকে র‌্যাবের হাতে আটক দুই ছাত্রের কোনো সন্ধান পাচ্ছে না তাদের পরিবার। র‌্যাব তাদের আটকের বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে।

রাজশাহী মহানগরী শাখার দপ্তর সম্পাদক মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম মাসুমকে ২০১৩ সালের ৪ এপ্রিল এবং এরও কিছুদিন আগে একই বছরের ২ এপ্রিল ঢাকা মহানগরী পশ্চিম শাখা শিবিরের আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হাফেজ মো. জাকির হোসেনকেও গ্রেফতার করে নিয়ে যায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। একই বছরের ২৩ জুন রাজশাহী বশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্র শিবিরনেতা মোঃ তাজাম্মুল আলী ও আজিজুল ইসলামকে ঢাকার বাড্ডা থেকে জনসমক্ষে ৮-১০ জন লোক আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে মাইক্রোবাসে করে উঠিয়ে নিয়ে যায়। এই দু’জনকে খুঁজতে এসে ২৬ জুন রাত ৮টার দিকে রাজধানীর গুলশান থানার সামনে থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ছাত্রকল্যাণ সম্পাদক আব্দুস সালাম ও ঢাকা মহানগরী উত্তর শাখার শিবির নেতা নুরুল আমিন গ্রেফতার হন। আদালতে হাজির না করে তাদেরকেও গুম করে রাখে সরকার। অজ্ঞাত স্থানে রেখে দীর্ঘ দিনের নির্যাতন শেষে মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম মাসুম, মোঃ তাজাম্মুল আলী, আজিজুল ইসলাম, আব্দুস সালাম ও নুরুল আমিনকে চোখ বাঁধা অবস্থায় রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় রেখে গেলেও ওয়ালিউল্লাহ,আল-মুকাদ্দাস ও হাফেজ জাকির হোসেনের সন্ধান মেলেনি আজও।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে ১৫-২০ জনের একদল সাদা পোশাকধারী লোক জয়পুরহাট জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি প্রভাষক নজরুল ইসলামকে ১১ এপ্রিল ২০১৩ বৃহস্পতিবার রাতে অপহরণ করে। তারা ঐ রাতে শহরের সাহেবপাড়া মহল্লার নজরুল ইসলামের বাসার কলাপসিবল গেটের তালা ভেঙে ৩ তলার উপরে উঠে যায় এবং বাসার মূল দরজা ধাক্কাধাক্কি করে নজরুল ইসলামের নাম ধরে ডাকতে থাকে। দরজা খুলে দিলে তারা তাকে একটি সাদা মাইক্রোবাসে উঠিয়ে নিয়ে যায়।
সিলেট জেলা ছাত্রদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক ইফতেখার আহমদ দিনারকে ২০১২ সালের ১ এপ্রিল র‌্যাব আটক করে গুম করেছে বলে অভিযোগ করেছে সিলেট জেলা বিএনপি। অন্যদিকে ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট সাভারের হেমায়েতপুর থেকে ৪ যুবককে র‌্যাব পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরা হলো-তুষার, মোহন, মিঠু ও মোস্তফা। আজও তাদের খোঁজ মেলেনি। এছাড়া বরিশাল নগরীর ২০ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদল সভাপতি অপহৃত ফিরোজ খান কালুর খোঁজও মেলেনি। চট্টগ্রাম নগরীর ঈদগাহ এলাকার ভাড়া বাসার কাছ থেকে কালুকে জোরপূর্বক কে বা কারা একটি গাড়িতে তুলে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করেন তার স্ত্রী আমেনা আক্তার দীপ্তি।

অপহরণের পর গুপ্তহত্যার শিকার যশোর জেলার ঝিকরগাছা থানা বিএনপি সভাপতি নাজমুল ইসলামের ঘটনায় দায়ের করা মামলাটিও পুলিশ সঠিকভাবে তদন্ত করছে না; উল্টো তদন্তের নামে পরিবারের সদস্যদের হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০১২ সালের ১৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ঢাকার বাংলামোটরে নিজ ব্যবসায়িক কার্যালয় থেকে বের হয়ে আর বাসায় ফিরে যাননি তিনি। পরে গাজীপুরের দক্ষিণ সালনা নামক স্থানে ঢাকা-ময়মনসিংহ রোডের পাশে তার লাশ পাওয়া যায়। জানা গেছে, এ ঘটনায় মোহাম্মদপুর থানায় দায়ের করা মামলা এখন গোয়েন্দা বিভাগে স্থানান্তর করা হয়েছে।
বরিশালের উজিরপুরের বিএনপি নেতা হুমায়ুন খান ঢাকার মলিবাগ থেকে সাদা পোশাকধারীদের হাতে আটকের পর দু’বছরেরও বেশি সময় ধরে নিখোঁজ রয়েছেন। ২০১০ সালের ২৩ নভেম্বর সকালে হুমায়ুন তার ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে ঢাকার সূত্রাপুরের ৪৫/ক, ঢালকানগর ফরিদাবাদের নিজ বাসা থেকে মালিবাগ চৌধুরীপাড়ায় এক বাসায় যান। সেখান থেকে সাদা পোশাকের একদল লোক নিজেদেরকে ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে তাকে আটক করে। এছাড়াও রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে গোয়েন্দা পুলিশ পরিচয়ে আটক করে নেয়া তিন যুবকের লাশ পাওয়া যায় গাজীপুর ও মুন্সীগঞ্জে। অন্যদিকে ধলেশ্বর নদী থেকে উদ্ধার করা হয় ছাত্রদল নেতাসহ ৮ জনের লাশ।

অপরদিকে ২০১০ সালের ৮ নভেম্বর চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানা বিএনপি সভাপতি ও করলডেঙ্গা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামকে র‌্যাব সদস্যরা গাজীপুর থেকে তুলে নিয়ে যায় বলে তার পরিবার অভিযোগ করেছে। গাজীপুর-জয়দেবপুর বাইপাস রোডের চৌরাস্তা এলাকা থেকে সাদা পোশাকধারী ৪-৫ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় দিয়ে তার গাড়ি থেকে জোর করে অন্য একটি গাড়িতে তুলে নেয়। এখন পর্যন্ত তার খোঁজ নেই। রাজধানীর শেরেইবাংলা নগরের আগারগাঁও এলাকার ৪১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি, তার মেয়েজামাই ও তার বন্ধু নিখোঁজ রহস্যের জট খোলেনি আজও। রাজধানীতে ছাত্র ইউনিয়ন নেতা শামিম ও একই সঙ্গে চার বন্ধুর নিখোঁজ হওয়ার ৮ মাসেও খোঁজ মেলেনি। নিখোঁজ চারজন হলেন পল্লবী এলাকার আবুল কালাম শেখ, আবুল বাশার শেখ, মিরপুরের আবদুর রহিম ও যাত্রাবাড়ীর ইস্রাফিল।
ট্রানব্যুনালে আল্লামা সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে আসলে সরকারের পক্ষ থেকে সুখরঞ্জন বালিকে অপহরণ করে গুম করা হয়। পরবর্তীতে তার খোঁজ মিললেও তা মিলেনি বাংলাদেশের কোথাও, বরং ভারতের দমদম কারাগারেই হয়েছে তার ঠিকানা।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ১৫৬ জন গুম হয়েছে; যার মধ্যে ২৮ জনের মৃতদেহ পাওয়া গেছে।

নির্বিচারে বিরোধী নেতাকর্মী খুন
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাঁচ বছরে দেশ ‘পলিটিক্যাল কিলিং জোনে’ পরিণত হয়। পুলিশ ও মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এ সময় সারাদেশে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী খুনের ঘটনা ঘটেছে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার। বিএনপি দাবি করেছে, তাদের ৩০ হাজারের বেশি নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ, তাদের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে এসব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত ঘটেছে। বর্তমান সরকারের আমলে সংঘটিত এসব হত্যাকাণ্ডের অধিকাংশ ঘটনারই চার্জশিট দাখিল করেছে পুলিশ; এমনকি এসব হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারীদেরও গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতেই দেশের বিভিন্ন স্থানে বহু বিরোধী নেতাকর্মী খুন হয়েছেন। গণতান্ত্রিক আন্দোলনসহ বিভিন্ন দাবিতে মাঠে নামলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নির্বিচারে চালানো গুলিতে তাদের মৃত্যু হয়। গুলিবিদ্ধ হয়ে পঙ্গু হয়েছেন অনেকেই।

অভিযোগ রয়েছে, নিহতদের পরিবার এসবের কোনো সুষ্ঠু বিচার পায়নি। অনেক ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বা পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরও করতে পারেনি। পুলিশ বাদি হয়ে উল্টো দলীয় নেতাকর্মী, ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবার ও আত্মীয় স্বজনকে আসামি বানিয়ে মামলা করে হয়রানি করে। তাদেরকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে এনে নির্যাতন চালায়। কিছু ঘটনায় তীব্র অভিযোগ ওঠায় গুলিবর্ষণকারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে সরকার তদন্ত কমিটি গঠন করলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। আর তদন্ত সংস্থা সেই পুলিশ বাহিনীর সদস্য অথবা সরকারি কর্মকর্তা হওয়ায় তাদের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। অনেক ঘটনা পুলিশ দিয়ে তদন্তের নামে আইওয়াশ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও নিহতদের পরিবারের বক্তব্য এবং অনুসন্ধানে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত চার বছরেই রাজনৈতিক সহিংসতা ও দুর্বৃত্তায়নের ফলে ৭৭৫ জন নিহত হন। ২০১৩ তে এ সহিংসতা আরও বেড়েছে। অধিকার-এর তথ্য অনুযায়ী ২০১৩ এর জানুয়ারি মাসেই রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নে ১৭ জন নিহত এবং ১৬৪৩ জন আহত হয়েছেন। তার পর থেকে পুরো ২০১৩ সাল জুড়ে পুলিশ র‌্যাব ও বিজিবিকে দাড় করে দেওয়া হয়েছে বিরোধী দলের বিপরীতে তাদেরকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যার জন্য। এ বছরের বিভিন্ন সময়ে বিরোধী দল কর্মাসূচি দিলেই তাদের উপর হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে এ বাহিনী। রাজনৈতিক নেতা হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি সরকার বরং সরকারের আজ্ঞাবহ ছাড়া যে বা যারাই আন্দোলন করেছে তাদেরকেই হতে হয়েছে হত্যা-গুমের শিকার।

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.