Tears of Victim

আওয়ামী অন্তর্কোন্দলে হত্যাকান্ড

523

ছাত্রলীগ ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭ ছাত্রনেতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে ছাত্রহত্যার রাজনীতি শুরু করে। ১৯৭৪ সালের ৪ এপ্রিল থেকে ২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত গত ৩৪ বছরে ছাত্রলীগের হাতে খুন হয়েছে ৬৫ জন শিক্ষার্থী। দিন দিন এ সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে চক্রাহারে। বর্তমান সরকারের আমল ২০০৯-২০১২ এ চার বছরেই ২৫ জন ছাত্রকে হত্যা করেছে তারা। শুধু ২০১২ সালেই দেশের ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা চালিয়ে ১০ জনকে হত্যা আর ১ হাজার ৭৮ জন শিক্ষার্থীকে আহত করে তারা। যাদের কোন আদর্শ নেই, মানবতাবোধ নেই তাদের কাছে ভাল কিছু আশা করাটা বোকামি আর অরণ্যে রোদন বৈকি। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ বাংলাদেশের ইতিহাসে দিয়েছে শুধু খুনের দীর্ঘ তালিকা যাতে কখনো চলে এসেছে নিজ দলের কর্মীদের নাম আবার কখনো অন্য রাজনৈতিক দলের কর্মীদের রক্তমাখা দাগ আর আজীবন তাদের নিষ্পেষণের শিকার সেই সাধারণ মানুষের খুনের বড়সড় পরিসর। আসুন দেখি গত ৫ বছরে তার কিছু আলোচিত নমুনা।

ঢাকা মেডিক্যাল ছাত্রলীগ নেতা রাজীব খুন
৩১ মার্চ, ২০০৯ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে নিজেদের মধ্যে সংঘাত করতে গিয়ে কলেজে ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ ওরফে রাজীবকে ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করে নিজের দলেরই ছাত্রলীগের ক্যাডাররা। এ সময় আরো ৫০ জন আহত হয়।

জাবিতে ছাত্রলীগ নেতাকে পিটিয়ে হত্যা
৮ জানুয়ারি, ২০১২ রবিবার। জুবায়ের আহমেদ ৩৭তম ব্যাচের ছাত্র। ক্যাম্পাসে এসেছিলেন ফাইনাল সেমিস্টারের শেষ পরীক্ষা দিতে। এখন শুধু ভাইভা বাকি। “মা এবার রেজাল্ট ভাল করলে ল্যাপটপ কিনে দিতে হবে” শেষ আর্জি ছিল জুবায়েরের। …তোরা কার বুকটি খালি কইল্লে… বিলাপ করছিলেন জুবায়ের এর মা। জুবায়ের এর আর ভাল রেজাল্টের জন্য অপেক্ষা করা হলো না। ছাত্রলীগ কর্মী ছিলেন তিনি। পূর্ব শত্র“তার জের ধরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের “ভিসি গ্র“প” হিসেবে পরিচিত ছাত্রলীগ ক্যাডার আশিকুল ইসলাম, খান মো রইস, রাশেদুলসহ ১২-১৩ জন জুবায়েরকে নির্মাণাধীন ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের পেছনে নিয়ে রড দিয়ে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে ফেলে আসেন। সেখানে অতিরিক্ত রক্তরক্ষণে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়েন কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নির্লিপ্ত ভূমিকা পালন করে চলে।

সিলেটে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে এমসি কলেজের ছাত্রলীগ নেতা পলাশ খুন
সিলেটে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে খুন হয় মুরারি চাঁদ (এমসি) কলেজের ছাত্রলীগ নেতা পলাশ। ২০১০ সালের ১২ জুলাই সোমবার দুপুরে এমসি কলেজ ক্যা¤পাসে এ ঘটনা ঘটে। নিহত ছাত্রলীগ নেতা উদয় সিংহ পলাশ গণিত তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। পলাশের গ্রামের বাড়ি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার গুলেরহাওর প্রকাশিত ভান্ডারীগাঁও গ্রামে।

পাবনায় দলীয় কোন্দলের জের ধরে ছাত্রলীগ কর্মী শান্তকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে খুন
২১ জানুয়ারি, ২০১২। ছাত্রলীগের সম্মেলনে নেতৃত্ব ও সমর্থনকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে এদিনে ঈশ্বরদীতে এক ছাত্রলীগ কর্মীকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষ। নিহত ছাত্রলীগ কর্মী মোস্তফা কামাল শান্ত (২১) পাবনা টেক্সটাইল কলেজের ৪র্থ বর্ষের ছাত্র ছিলেন। জানা যায়, ঈশ্বরদী শহরের মশুরিয়া পাড়া এলাকার বাসিন্দা পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানির ঠিকাদার আবুল কালাম আজাদের ছেলে শান্ত শনিবার পরীক্ষা দিতে পাবনায় যাচ্ছিলেন। এ সময় প্রকাশ্যে যুবলীগ কর্মী রুবেল ও আল-আমিনসহ বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসী ছুরিকাঘাত করে। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়ার কিছুক্ষণ পর সে মারা যায়।

নরসিংদীর পৌর সভার মেয়র লোকমান হত্যাকাণ্ড
গত ১ নভেম্বর, ২০১১ ইং তারিখে সন্ধ্যা সাড়ে ৭ টার দিকে নরসিংদী পৌরসভার মেয়র এবং শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক লোকমান হোসেনকে সন্ত্রাসীরা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে উপর্যুপরি গুলি করে পালিয়ে যায়। এরপর লোকমান হোসেনকে (৪২) ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে আনা হলে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করে। দলীয় কোন্দলের রেশ ধরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে মেয়র লোকমানের স্ত্রী এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ বরাবরই অভিযোগ করে আসছেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী রাজিউদ্দিন রাজুর ভাই সালাউদ্দিন বাচ্চু জড়িত থাকার কথা।


পদ্মা সেতুর টাকা তোলার দ্বন্দ্বে ছাত্রলীগ কর্মী খুন
১৫-০৭-২০১২ রাত আনুমানিক ১১টা, নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর ‘আমরাই নির্মাণ করব পদ্মা সেতু স্লোগানে গত ১২ জুলাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চাঁদা তোলা শুরু করেছিল ছাত্রলীগ। আর এই পদ্মা সেতুর জন্য টাকা তোলা নিয়ে দ্বন্দ্বের জের ধরে আব্দুল্লাহ আল হাসান সোহেল নামে এক ছাত্রলীগ কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি আহমেদ আলী (মাদার বক্স হল) এবং সাধারণ সম্পাদক আবু হুসাইন (সোহরাওয়ার্দী হল) এর মধ্যে পদ্মা সেতুর জন্য টাকা তোলা নিয়েই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয়। তাদের মধ্যে পারস্পরিক গুলি বিনিময়ের এক পর্যায়ে আবদুল্লাহ আল-হাসানের কপালের বাঁ-দিকে গুলি লাগে। গুলিবিদ্ধ হয়ে ১৬ তারিখ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তিনি মারা যান। তিনি রাবি-র সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র।

ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের গোলাগুলিতে নিহত ১
২৯ নভেম্বর, ২০১৩ ইং রাত ১২টার দিকে ঢাকা কলেজে ছাত্রলীগের সভাপতি ফুয়াদ হাসান পল্লব এবং সাধারণ সম্পাদক সাকিব আল হাসান সুইম গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে রকিব আল ফারুক (২৬) নামে এক ছাত্র নিহত হয়েছেন। তিনি ঢাকা কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র ছিলেন। এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধসহ আরও পাঁচজন আহত হয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে যে ইয়াবা বিক্রয় এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই গ্রুপের মধ্যে দেশীয় অস্ত্র এবং আগ্নেয়াস্ত্রের মহড়া, গোলাগুলি, ককটেল বিস্ফোরণে ওই ছাত্র নিহত হয়।

মতিঝিলে আ.লীগ নেতা মিল্কি খুন
২৯ জুলাই, ২০১৩ রাত ১টার সময় পাঞ্জাবি-পাজামা, মাথায় টুপি পরে রাজধানীর গুলশানে ব্যস্ততম শপিং মলের সামনে ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াজুল হক খান মিল্কিকে (৪২) প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে তারই দলের আরেক নেতা এস এম জাহিদ সিদ্দিকী ওরফে তারেক। ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য একদিকে যেমন তারেক বেশ ধারণ করেছিল ঠিক তেমনি ঘটনাকে ধামা চাপা দেওয়ার জন্য ৩১ তারিখ, বুধাবার রাতে ক্রসফায়ার দিয়ে মেরে ফেলা হয় তারেককে। প্রাথমিকভাবে আওয়ামী নেতৃস্থানীয় মহল থেকে এটাকে বিরোধী দলের কান্ড, পরকীয়া ঘটিত হিসেবে চালানোরও চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তা ঘাটে পানি পায়নি। তারেকের সাথে শাহজাহানপুরসহ আশপাশের এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে মিল্কির বিরোধ ছিল বলে জানা গিয়েছে।

এছাড়াও, ২০১০ সালের ২৬ জুলাই রাজধানীর কাফরুলে আওয়ামী লীগ নেতার হাতে ১৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি গিয়াস উদ্দিন গেসু খুন হন। ১৩ আগস্ট সংসদ ভবন এলাকায় গুলিতে নিহত হন যুবলীগ নেতা ইব্রাহীম। তার হত্যার সাথে ভোলা লালমোহন আসনের সংসদ সদস্য নুরুন্নবী শাওনের সম্পৃক্ততার খবর পাওয়া যায়। অভ্যন্তরীণ কোন্দলে রাজধানীর জুরাইনে ২০১১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি খুন হন আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ উল্লাহ। এছাড়া চলতি ২০১৩ সালের ২৭ মে বগুড়ায় স্বেচ্ছাসেবক লীগের জেলা সভাপতির উপস্থিতিতে তার দলের ক্যাডাররা কুপিয়ে হত্যা করে যুবলীগ নেতা মজনু ও তার ভাতিজা নাহিদকে। ১৭ জুলাই বরিশাল পলিটেকনিক কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান রিয়াজ খুন হন পিরোজপুর জেলা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হাতে। ১৮ জুলাই সাভারে আওয়ামী লীগ নেতার হাতে মিন্টু রঞ্জন দাস নামে এক ছাত্রলীগ কর্মী খুন হন।

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.