Tears of Victim

পিলখানা ট্র্যাজেডি : বিডিআর-এ সেনা কর্মকর্তা হত্যাযজ্ঞ

623

দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বর্বর এবং বেদনাদায়ক ট্র্যাজেডি বিডিআর বিদ্রোহ ও সেনা কর্মকর্তা হত্যাযজ্ঞ। ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি বিডিআর বিদ্রোহে স্বজনহারা পরিবারগুলোর কান্না আজও থামেনি। তেমনি সেই দুঃখজনক স্মৃতি সাধারণ মানুষও ভুলতে পারছে না। কিন্তু কেন এই হত্যাযজ্ঞ, এর নেপথ্যে কারা ছিল সেই প্রশ্নের জবাবও ট্র্যাজেডির নেপথ্য রহস্য আজও উন্মোচিত হয়নি। জনসম্মুখে প্রকাশ হয়নি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনগুলোও। তেমনি এ ঘটনার বিচার নিয়েও চলছে অসন্তোষ। প্রকৃত হত্যাকারী এবং ষড়যন্ত্রের নায়করা ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছে। অনেকেই বর্তমান বিচার প্রশ্নবিদ্ধ বলে উল্লেখ করেছেন।

প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, ১৯৭১ সালে দীর্ঘ ৯ মাসের স্বাধীনতা যুদ্ধে আমাদের ৫১ সামরিক কর্মকর্তা শহীদ হয়েছিলেন। আর এই স্বাধীন দেশে ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্র“য়ারি মাত্র দু’দিনের বিদ্রোহে পিলখানায় কর্মরত ৫৭ সেনা কর্মকর্তা, একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা, দুজন সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী, ৯ বিডিআর জওয়ান, পিলখানার বাইরে সেনাবাহিনীর এক সিপাহি, এক পুলিশ কনস্টেবল ও তিন পথচারী নিহত হয়েছিলেন। ২৫ ফেব্র“য়ারি পিলখানার সুয়ারেজ লাইন দিয়ে বুড়িগঙ্গায় গিয়ে পড়েছিল ৩ সেনা কর্মকর্তার লাশ। ২৬ ফেব্র“য়ারি রাতে বিদ্রোহীরা অস্ত্র সমর্পণের পর ২৭ ফেব্র“য়ারি মাটিচাপা অবস্থায় পাওয়া গেছে লাশের স্তুপ। অর্ধশত সাহসী ও নির্র্ভীক নিরস্ত্র সেনা কর্মকর্তার সারি সারি লাশ দেখে স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল গোটা দেশের মানুষ। বর্বর এই হত্যাকাণ্ড কারা ঘটিয়েছে, কারা এর অর্থের জোগান দিয়েছে, কারা পরিকল্পনা করেছে, কী তাদের উদ্দেশ্য ছিল এসব বিষয় আজও রহস্যাবৃত। ঘটনার পর সেনাবাহিনী থেকে একটি এবং সরকারের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছিল। কিন্তু এইসব তদন্ত কমিটির দেয়া প্রতিবেদনগুলো আজও প্রকাশ করেনি সরকার।

হত্যাকাণ্ডের আগে অবরুদ্ধ সেনা কর্মকর্তারা সরকারের কাছে সাহায্য চেয়ে আকুতি জানিয়েছিলেন। সেনা অভিযান চালিয়ে তাদের জীবিত অবস্থায় উদ্ধারের জন্য আকুতি করেছিলেন। কিন্তু সরকার তাতে কোনো সাহায্যের হাত বাড়ায়নি।

ঘটনা তদন্তে সরকার গঠিত কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী পিলখানা হত্যাকাণ্ড, লুটতরাজ ও অন্যান্য অপরাধ পরিকল্পনার সঙ্গে বিডিআরের অনেক সদস্যসহ বিপুলসংখ্যক বেসামরিক ব্যক্তিও জড়িত ছিল। প্রায় দু’মাস ধরে এর পরিকল্পনা চলছিল। এমনকি নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই পরিকল্পনার কিছু তথ্য-প্রমাণ মেলে। কারণ নির্বাচনের আগে বিডিআরের বেশকিছু সদস্য মহাজোট প্রার্থী ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপসের (বর্তমানে সংসদ সদস্য) অফিসে যান। তাদের মধ্যে হাবিলদার মনির, সিপাহি তারেক, সিপাহি আইয়ুব, ল্যান্স নায়েক সহকারী সাইদুরসহ ২৬ জওয়ানের নাম জানা গেছে। তারা লালবাগ থানা আওয়ামী লীগ ক্যাডার জাকিরের মধ্যস্থতায় তাপসের সঙ্গে কথা বলেন। প্রতিশ্র“তি দেন তার পক্ষে কাজ করার। ২০০৯ সালের ফেব্র“য়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে শেখ সেলিম এমপির বাসায় দুজন ডিএডি এবং আওয়ামী লীগ কর্মী জাকিরের মধ্যস্থতায় ১০ থেকে ১২ বিডিআর জওয়ান সাক্ষাৎ করেন। এ মামলায় বিএনপি নেতা নাসির উদ্দিন আহম্মেদ পিন্টু ও বিএনপির স্থানীয় নেত্রী সুরাইয়া বেগমের নামও রয়েছে। এ মামলার ২০ আসামি এখনও পলাতক। সর্বশেষ এ মামলার রায় প্রকাশিত হলেও তার প্রতি সন্তুষ্ট হতে পারেনি ভুক্তভোগী সেনা পরিবার ও দেশবাসী।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ঐতিহ্যের ধারক ও বাংলার সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী ছিল বিডিআর। একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে তাদের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। দেশের সীমান্ত রক্ষা, বিদেশী আগ্রাসন ও চোরাচালান প্রতিরোধে বাংলাদেশ রাইফেলস বা বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) ছিল নির্ভীক। আইন অনুযায়ী সব সময় বিডিআরের মূল নেতৃত্ব ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হাতে। সেনাবাহিনী থেকে প্রেষণে আসা সাহসী কর্মকর্তাদের দিয়ে পরিচালনা করা হতো বিডিআর। সেই বিডিআরকে সেনাবাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন করার দেশী-বিদেশী ঘৃণ্য চক্রান্তের মাধ্যমে ঘটানো হয়েছে বিডিআর বিদ্রোহ। দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তাদের টার্গেট করে হত্যা করা হয়েছে সেদিন।

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.