Tears of Victim

শহীদ ডা: ফয়েজ আহমদ কত কথা কত স্মৃতি

510

লক্ষ্মীপুরের লক্ষ্মী গাঁয়ের সৌভাগ্যবান সন্তান শহীদ ডা: ফয়েজ আহমাদ। আন্দোলনের যে কোন কর্মীর জন্য শহীদ ফয়েজের সাহচর্য ছিলো এক পরম পাওয়া। আল্লাহর শুকরিয়া আমি দীর্ঘদিন এক সাথে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। ডা: ফয়েজ কে নিয়ে এসময় আমায় কলম ধরতে হবে তা কখনো কল্পনায়ও ভাবিনি। আমাকে যখন বলা হলো শহীদ ফয়েজ ভাইকে নিয়ে লিখার জন্য, তখন আমি বললাম তোমাদের স্মারক কত পেইজের হবে, আমার জীবনজুড়েই তো ফয়েজ ভাইয়ের স্মৃতি। অজস্র স্মৃতি। তাঁর সাথে আমার পরিচয় ঊনিশশো আটাশি থেকে, স্ত্রীর অসুস্থতা জনিত কারণে চেম্বারে আসা, তখনো আলোর দিশা পাইনি, সংগঠনে যোগদানের পর থেকে উনার সাথে আমার জীবনের অব্যাহত পথ চলা শুরু, আমার বয়োজ্যেষ্ঠ ডা: ফয়েজ লক্ষ্মীপুর জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি (২০০২-০৯) এবং শাহাদাতের আগ পর্যন্ত তিনি নায়েবে আমিরের (২০০৯-১৩) দায়িত্ব পালন করেন।
এদীর্ঘ সময়ে জেলা আমীর হিসেবে আমার প্রতি উনার শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, মমত্ববোধ আমাকে প্রতিনিয়ত অবাক করতো। ডা: ফয়েজকে নিয়ে আমার ভালবাসার মুহূর্ত স্মরণ করতে গেলে আমি আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়ি, আজ নিজেকে অনেক বেশি ভাগ্যবান মনে হয় ।

লক্ষ্মীপুরের একজন জনপ্রিয় চিকিৎসক ছিলেন ডা: ফয়েজ, শুধু মাত্র শরীরবৃত্তীয় রোগের চিকিৎসক ছিলেন না তিনি, জনশক্তির হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করে মানসিক উৎকর্ষ সাধনে সদা সচেষ্ট ছিলেন। আন্দোলনের যে কোন প্রয়োজনে যে কোন মুহূর্তে ছিলেন আস্থার প্রতীক। পেশাগত ব্যস্ততার মাঝেও সংগঠনের যে কোন কর্মসূচিতে ফয়েজ ভাই সবার আগে হাজির থাকতেন। ব্যক্তিগত জীবনেও সময়ানুবর্তী ছিলেন ডা. ফয়েজ কারণ সময়ানুবর্তিতার ব্যর্থতাকে চারিত্রিক দুর্বলতা মনে করতেন তিনি। চিকিৎসক হিসেবে রোগীর সেবার পাশাপাশি, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি পরবর্তীতে নায়েবে আমীরের দায়িত্ব পালন করা ছিলো অনেক দুরূহ, সে কঠিন কাজটি শহীদ হবার আগ পর্যন্ত অত্যন্ত সাবলীলভাবে আন্জাম দিয়েছেন তিনি।
দায়িত্ব নিয়ে কাজ করা ছিলো তাঁর সহজাত অভ্যাস। জেলা জামায়াতের সর্বশেষ কর্মপরিষদ বৈঠকেও তিনি নিজে বছরের প্রথম সভায় দারস দেবার আগ্রহ পোষণ করেন। সে হিসেবে নতুন বছরে কর্মপরিষদের প্রথম সভায় দারস দেবার কথা ছিলো জেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর ডা: ফয়েজ আহমদের। কিন্তু স্রষ্টার পরিকল্পনা ভিন্ন।
জামায়াত, শিবির, ছাত্রীসংস্থার প্রোগ্রামের দারসের অঘোষিত নিয়মিত মেহমান ছিলেন ডা: ফয়েজ। জীবনের শেষ মুহূর্তেও সে ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে চেয়েছেন তিনি।
ত্যাগ, কোরবানি, ঈমান, ইসলাম, ইহসান, আদল, আখিরাত, তাক্বওয়া সম্পর্কিত বিষয়গুলোই ছিলো তাঁর আলোচনার বিষয়। কারণ ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ইসলামের এ বিধিবিধানগুলোর ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর ছিলেন।
লক্ষ্মীপুর বাস টার্মিনালের পাশে বাসা হবার কারণে ডা: ফয়েজের চেম্বারে দুস্থ, অসহায় দরিদ্র শ্রমিকদের আনাগোনা ছিল নিয়মিত দৃশ্য। তিনি তাদের বিনা পয়সায় চিকিৎসা করাতেন। যার দরুণ তার চেম্বারকে অনেকেই দাতব্য চিকিৎসালয়ের সাথে তুলনা করতেন। চিকিৎসক এবং রোগীর সম্পর্কের ঊর্ধ্বে শ্রমিকরা ডা: ফয়েজের সাথে ব্যক্তিগত যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করতেন। ব্যক্তিগত সখ্যতাকে কাজে লাগিয়ে শ্রমিকদের মাঝে তিনি দাওয়াতি কাজ করতেন।
শ্রমিকদের মাঝে আন্দোলনের দাওয়াত প্রসারের ক্ষেত্রে জনাব ফয়েজের ভূমিকা অনন্য। আন্দোলনের ভাইবোনদের যেকোন সমস্যা সমাধানে তিনি ছিলেন সবচাইতে অগ্রগামী। বিশেষ করে যেকোনো অসুস্থতায় সেবা নেবার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সকলের প্রথম পছন্দ। আমাদের কাছে তিনি ছিলেন সর্ব স্পেশালিস্ট চিকিৎসক। কারণ যে কোন ক্ষেত্রে আমি লক্ষ্য করতাম সকলে আগে ডা: ফয়েজের কাছে পরামর্শ চাইতো, তিনিও তাঁর অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাতেন। রাজনৈতিক অস্থিরতার দরুন বিভিন্ন সংঘর্ষে আহত ভাইদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে ডা: সাহেব ছিলেন সদা প্রস্তুত। লক্ষ্মীপুরের শহীদ ফজলে এলাহী, শহীদ আহমদ জায়েদ, শহীদ কামাল হোসেন, শহীদ মহসিনের শাহাদাতের সময়েও তাঁদের পাশে থেকেছেন। চিকিৎসা সেবা দিয়ে সুস্থ করার চেষ্টা করেছেন।।
সর্বশেষ গত ১৪ আগস্ট রায়পুর চাঁদপুরের বর্ডারে বাকশালী পুলিশের হামলায় গুলিবিদ্ধ আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে নিজে তৎপর থাকার পাশাপাশি ছেলে ডা: হাসানুল বান্নাকেও তৎপর রেখেছেন। আহত গুলিবিদ্ধদের প্রাথমিক চিকিৎসা, সার্জারি শেষ করে, পুলিশি গ্রেফতারের আশঙ্কায় হাসপাতালে না রেখে নিজ দায়িত্বে নির্জন স্থানে ধারাবাহিক চিকিৎসা প্রদান করেছেন।

আমার অসুস্থতায়, সংবাদ না পাঠালেও প্রায় সময় উনি আমার বাসায় চলে আসতেন এবং আমার চিকিৎসা করাতেন। আমিসহ আমার পরিবারের সদস্যদেরকে তিনি অনেক ভালোবাসতেন। আমার পরিবারের তত্ত্বাবধান করার ক্ষেত্রে ডা: সাহেব আমার চেয়ে কোন অংশে কম করতেন না। আমার পরিবার, আত্মীয় স্বজনদেরও অতি আপনজন ছিলেন। ২০০৪ সালের ঘটনা। আমার তীব্র ডায়রিয়া হয়, যে কোন কারণে আমার স্ত্রী পাশে ছিলো না, খবর পেয়ে ফয়েজ ভাই আমাকে উনার বাসায় নিয়ে গেলেন নিজে হাতে আমার যাবতীয় ঔষধ খাইয়ে দিয়েছেন। ধারাবাহিক চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি, ময়লা পরিধেয় পরিবর্তন এবং পরিষ্কার করে ফয়েজ ভাই আমাকে চিরঋণী করে গেছেন। যা কোন ভাবেই শোধ হবার নয়। অজস্র স্মৃতির এ একটি মাত্র উদাহরণই, জেলা আমীরের প্রতি জেলা সেক্রেটারির ভালবাসার গভীরতা কতটুকুন ছিলো তার প্রমাণ এবং স্পষ্টভাষী, বিনম্র ডা: ফয়েজের ব্যক্তিত্বের বাস্তবতা উপলব্ধির জন্য যথেষ্ট।

ডা: ফয়েজ ব্যক্তিগত জীবনে সদালাপী, প্রাণবন্ত অতিথিপরায়ণ একজন মানুষ ছিলেন। লক্ষ্মীপুরে আগত জামায়াত, শিবিরের কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীলরা ফয়েজ ভাইয়ের বাসভবনেই অবস্থান করতেন। জনাব ফয়েজ তাঁর জীবদ্দশায় বিশিষ্ট লেখক খুররম জা মুরাদ থেকে শুরু করে, কারান্তরীণ আমীরে জামায়াত, সেক্রেটারি জেনারেল, এসিসটেন্ট সেক্রেটারি জেনারেল কামারুজ্জামান, মুুজিবুর রহমান ভাইসহ বহু দায়িত্বশীলের আতিথেয়তা করেছেন।
জনাব ফয়েজের জীবনের অনন্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দানশীলতা। আন্দোলনের যে কোন প্রয়োজনে তিনি তাঁর অবস্থান থেকে সর্বোচ্চটা দেবার চেষ্টা করতেন। তিনি নিজ বাসভবনের ৩য় তলার একটি ইউনিট মহিলা সংগঠনকে ওয়াকফ্্ করে দেন। তিনি নিচতলায় একটি ইউনিট জামায়াতের কার্যক্রমের জন্য ছেড়ে দেন। বর্তমান জেলা জামায়াতের অস্থায়ী অফিস তাঁর বাসার নিচের তলায়ই অবস্থিত।
মাস্টার শফিকুল্লাহ সাহেবের পরে লক্ষ্মীপুর শহরে ফয়েজ ভাইয়ের জনসম্পৃক্ততা ছিলো সবচাইতে বেশি। রাজনীতির ঊর্ধ্বে দলমত নির্বিশেষে তিনি সবার জন্য কাজ করতেন। শহীদ ফয়েজ যতটা না রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন, তার চাইতে বেশি সামাজিক ছিলেন। গরিব অসহায় দুস্থদের বিনা পয়সায় চিকিৎসা করাই ছিলো তাঁর সখ। একথা নিশ্চিত করে বলা যায়, পঁয়ত্রিশ বছরের চিকিৎসা পেশায় লক্ষাধিকেরও অধিক মানুষ ডা: ফয়েজ কর্তৃক উপকারভোগী হয়েছেন।
জনসাধারণের চিকিৎসার পাশাপাশি ব্যক্তি জীবনে একজন সফল উদ্যোক্তাও ছিলেন ডা: ফয়েজ। তিনি লক্ষ্মীপুরের প্রথম প্রাইভেট কোম্পানি ও হাসপাতাল লক্ষ্মীপুর আধুনিক হাসপাতাল প্রাইভেট (লিঃ), প্রতিষ্ঠা করেন লক্ষ্মীপুর পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ, হলিহার্ট স্কুল এন্ড কলেজ, নিরাপদ ফুড্্স লিঃ, নিরাপদ আবাসন লিঃ, আয়েশা (রাঃ) মহিলা মাদ্রাসা। এ ছাড়াও তিনি বায়োফার্মা গ্র“পসহ আরও বিভিন্ন বেসরকারি, প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানির সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি তাঁর গ্রামের বাড়ির মানুষের চিকিৎসা সেবায় এলাকায় কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠার জন্য জমি দান ও নিজ এলাকায় মসজিদ উন্নয়নের জন্য সহযোগিতাসহ আরও অনেক উল্লেখযোগ্য সামাজিক কর্মকাণ্ড করেন।

লক্ষ্মীপুরে আন্দোলনের কাজকে এগিয়ে নেবার ক্ষেত্রে, জনদরদি ডা: ফয়েজকে আওয়ামী সরকারের জুলুমের শিকার হতে হয়েছে বহুবার। বিরোধীদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে তিনি বরাবরই সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। ১১ ডিসেম্বর ২০১৩ জেলা বিএনপির সেক্রেটারি সাবুর উপর হামলার পর উনাকে নিরাপদে থাকার পরামর্শ দেয়া হলে, তিনি বলেন আল্লাহ চাইলে কেউ আমার শাহাদাত ঠেকাতে পারবে না। এ ধরনের সাহসী উচ্চারণ কেবল ডা: ফয়েজের মত ঈমানদার লোকদের পক্ষেই করা সম্ভব।
মোল্লা ভাইয়ের শাহাদাত পরবর্তী লক্ষ্মীপুরবাসী যখন শোকে মুহ্যমান সেই মুহূর্তে গভীর রাতে গেট ভেঙে বাসায় প্রবেশ করে বাসভবনে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় যৌথ বাহিনী। পরিবারের সদস্যদের সাথে অসদাচরণের একপর্যায়ে অসুস্থ ফয়েজ ভাইকে জোর করে টেনে হিঁচড়ে ছাদে নেয়। ছাদে দীর্ঘক্ষণ নির্যাতন করে গুলি করে হত্যা নিশ্চিত করে। র‌্যাবের ছদ্মাবরণে বাকশাল বাহিনী। হানাদাররা ডা: ফয়েজকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি। বরং চারতলার ছাদ থেকে ফেলে দেয়। সে দিন বাকশালীরা ফয়েজ ভাইয়ের মরদেহকে ছাদ থেকে ফেলে দেয়নি বরং মানবতা মনুষ্যত্বকে তারা ফেলে দিয়েছে। আব্দুল কাদের মোল্লা ভাইয়ের শাহাদাতের পর ফয়েজ ভাই আল্লাহর দরবারে কেঁদে কেঁদে শাহাদাত কামনা করেছিলেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁর দোয়া এত দ্রুত কবুল করবেন তা ভাবতেও পারিনি। সদাকর্মমুখর, জনহিতৈষী এক আলোকিত মানুষের প্রতিচ্ছবি ছিলেন শহীদ ফয়েজ। পুরো জীবন যিনি দেশ জাতি ইসলাম রক্ষার খেদমত করে বাংলাদেশসহ বিশেষ করে লক্ষ্মীপুরবাসীকে ঋদ্ধ করে গেছেন।

সবশেষ শাহাদাতের নজরানা পেশের মাধ্যমে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের চিরঋণী করে গেছেন। শহীদ ফয়েজের আজন্ম লালিত স্বপ্ন বাংলার জমিনকে ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার উপযোগী করে তোলার মাধ্যমেই কেবল সেই ঋণ পরিশোধ সম্ভব। সে আলোকিত দিনের প্রত্যাশায়।

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি :
নাম: ডা: ফয়েজ আহমদ।
পিতা: মৃত জয়নাল আবেদীন।
মাতা: মৃত আমেনা বেগম।
জন্ম: ১৯৪৬ সাল।
জন্মস্থান: লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ থানার ৭নং লামচরের রসূলপূর গ্রামের জয়নাল আবেদীন ভাট বাড়ির নিজ পিত্রালয়ে জন্মগ্রহণ করেন।
পরিবার: ৪ ভাই ৩ বোনের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন। তিনি ২ ছেলে ও ২ মেয়ের জনক ছিলেন।
পেশা: চিকিৎসক, তিনি বিভিন্ন বেসরকারি ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ও অংশীদার ছিলেন।
সাংগঠনিক দায়ীত্ব: লক্ষ্মীপুর জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি (২০০২-০৯) এবং শাহাদাতের আগ পর্যন্ত তিনি নায়েবে আমিরের (২০০৯-১৩) দায়িত্ব পালন করেন।
শাহাদাতের ঘটনা : ১৩ ডিসেম্বর রাত ১২টা, র‌্যাব বাসার গেট ভেঙে প্রবেশ করে ডা: ফয়েজকে ছাদে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ নির্যাতন করে গুলি করে হত্যা নিশ্চিত করার পর চার তলার ছাদ থেকে ফেলে দেয়।

লেখক : এস ইউ এম রুহুল আমিন ভূঁঞা

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.